রাজিয়া সামাদ ডালিয়া
রাজিয়া সামাদ ডালিয়া
আমার প্রান্তিক পথ চলতে চলতে শেডাস এর শুরুটা যেভাবে হলো শেরপুর চলে আসি প্রান্তিক অসহায়ের সহায় হব বলে। কোথা থেকে শুরু করব তেমন স্পষ্ট কোন ধারণা ছিল না। কেমন করে যেন শেরপুর সদর হাসপাতাল আমার নিত্যদিনের সেবার স্থান হয়ে দাঁড়াল। সেই সময় অপ্রতুল ডাক্তার। তাদের সেবার মানও কোন পর্যায়ে পড়ে না। সকালে যাই। রুগীদের ডাক্তারের কাছে পৌঁছে দেয়া, ব্যবস্থাপত্র হাতে নিয়ে তাদের ঔষধপত্র বুঝিয়ে দেয়া আমার নিত্যদিনের কাজ হয়ে দাঁড়াল।
এমনকি রেফার্ড রোগীদের ময়মনসিংহ ও ঢাকায় পঙ্গু হাসপাতাল, পিজি হাসপতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে নিয়ে পৌঁছে দিতে শুরু করলাম। এদের সাথে যেন গাঁটছড়া বেঁধে ফেললাম।
এভাবেই আমি বারডেমেও ডায়াবেটিক রোগীদের নিয়ে গেলাম। একটা রোগীকে কয়েকবার নিয়ে যেতে হলো। বারডেমের সমাজ কল্যাণের ডিরেক্টর- মিনতি প্রভা চৌধুরী আমাকে প্রশ্ন করলেন রোগী কি হয় আপনার? আমি বললাম- কিছু হয় না। ওদের কেউ নেই বলে আমি নিয়ে আসি। শুধু এখানেই নয়। অন্য হাসপাতালেও আমি রোগী নিয়ে আসি। তিনি আমার ফ্যামিলি হিস্ট্রি শুনলেন। বললেন চলুন তো মেজর জেনারেল ডাঃ এ আর খান স্যারের কাছে। ছোট খাট ফর্সা মানুষটি যেন বিনয়ের অবতার। আমাকে চমৎকার একটা গাইড লাইন দিলেন। আমি চলে এলাম শেরপুর। আমার বাবার ভাঙাচোড়া বাড়িতে আমি থাকতাম। তারই সামনের দিকটায় শুরু হল শেরপুর ডায়াবেটিক সমিতির পথচলা। রং কিনে সামনের দিকটা ঝকঝকে করে তুললাম। ব্রাশ হাতে যখন কাজে নামলাম পাশে এসে দাঁড়াল দিলু, পারভীন, আলী।
ডাক্তার হিসেবে এলেন ডাঃ ওয়াহেদ মিয়া। অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ। ডায়াবেটিক সমিতির তিনি হয়ে উঠলেন কর্ণধার। যেদিন একজন রোগীও পেতাম না সেদিন আমি ডায়াবেটিস পরীক্ষার জন্য রক্ত দিতাম যেন একদিনও খালি না যায়। একটা খাতা বানিয়ে নিলাম ফান্ড তোলার জন্য। পাঁচ টাকা করেও সংগ্রহ করতাম। প্রথম দিকে ফুটপাত থেকে ত্রিশ চল্লিশ টাকা মূল্যের ক'টা চেয়ার কিনে নিয়েছিলাম। একবার সেই সময়কার এসপি মহোদয় এলেন ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে। এসপি মহোদয়ের সঙ্গী একটি চেয়ারে বসেছেন আর ওমনি চেয়ার ভেঙে পড়ে গেলেন। আমি ভারি লজ্জিত হয়ে পড়লাম। বললাম- ভাগ্যিস আপনি পড়ে যান নি। ফুটপাথের চেয়ার আর কদিনই বা টিকবে। তিনি ফিরে গিয়ে তাঁর অফিসের লোক দিয়ে দামী চারটা চেয়ার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এভাবে নানা জনের নানা অনুদানে শেরপুর ডায়াবেটিক সমিতি চলতে শুরু করল। একদিন গ্রীষ্মকালের প্রচন্ড গরমে রোগীরা অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। আমাকে দেখে তাদের সঙ্গীন অবস্থা বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগলেন। আমিও বিব্রত বোধ করছি। কি করা যায়। হঠাৎ আঁচল পেতে দাঁড়ালাম। আপনাদের যা আছে দিন তো আমার আঁচলে। এক ঘন্টার মধ্যেই ফ্যান চলে আসবে। চার আনা থেকে একশ টাকায় আমার আঁচল ভরে উঠল। ঘাটতি ছিল দেড়শ টাকা ডাঃ মামুন জোস তক্ষুনি দেড়শ টাকা পাঠিয়ে দিলেন। সত্যিই এক ঘন্টার মধ্যে ফ্যান চলে এলো কানেকশন হয়ে গেল। রোগীদের মাথার উপর ফ্যান ঘুরতে লাগল। রোগীদের মনে স্বস্তি নেমে এলো। এভাবে কত ছোট ছোট ফান্ড সংগ্রহ হয়েছে। তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান করে ফেলেছি।
সে দিনগুলো এখন চোখের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। প্রথম সংকট ছিল ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান। মতি ও হাসমত এই দুজনকে নিয়োগ দিয়ে মতিকে পাঠালাম জামালপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালে। হাসমতকে নিয়ে চলে গেলাম ঢাকায়। একজন আর্মি পারসন ডাঃ মল্লিক। অত্যন্ত সদাসয় ব্যক্তি। সব নিয়মকে বাইপাস করে তিনি ল্যাবরেটরিতেই হাসমতকে রাতে ঘুমাবার ব্যবস্থা পর্যন্ত করে দিয়েছিলেন। এভাবেই মতি ও হাসমত প্রশিক্ষিত হয়ে ল্যাবরেটরির কাজ শুরু করেছিল।
এর মধ্যে দৈনিক ভোরের কাগজে আমার নামে যা নয় তাই লিখে ছাপিয়ে দিল। আমার চোখে পড়ে নি। ডাঃ ওয়াহেদ মিয়া মসজিদে জোহরের নামাজ পড়তে যাবার সময় আমার টেবিলে রেখে গেলেন। লেখাটি পড়লাম। বড় বিষন্ন হয়ে পড়লাম। নামাজ শেষে ফিরে এলেন। টেবিল থেকে খবরের কাগজটি তুলে নিলেন হাতে। বললেন ঘাবড়াবেন না। কেউ কিছু করতে পারবে না। আমরা জানি আপনি কেমন। সত্যিই আমি এটা নিয়ে ভাবনা করা ভুলে গেলাম। তবে নানাভাবে আমাকে উত্যক্ত করার কাজ অব্যাহত ছিল, যদিও আমি তা কখনই আমলে নেইনি।
আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করলাম টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস কতটা ভয়াবহ। আমি শিশু ডায়াবেটিস রুগীদের আমার বাড়িতে রাখতে শুরু করলাম। তাদের ইনসুলিনের পাশাপাশি ব্যালেন্সড ডায়েটের ব্যবস্থা হল। আমি আনন্দের সাথে খেয়াল করলাম গড়াতে গড়াতে যে শিশুগুলো এলো আমার কাছে। বিশ একুশ দিনের মাথায় তারা এটা সেটা ধরে দাঁড়াতে পারছে। তিন মাসের মধ্যে তারা কোন অবলম্বন ছাড়াই উঠে দাঁড়াচ্ছে। ওদের এই একটু একটু করে সুস্থ হয়ে ওঠার দৃশ্য যে কি আনন্দের তা বলে বোঝাতে পারব না। এখন একটা উপলব্ধি হল যে, ছেলে মেয়েরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে তারা কি করবে? ২০০৭ এ পুনর্বাসনের কথা ভাবতে শুরু করলাম।
দশ জন রোগী বেছে বের করলাম যাদের বয়েস আঠেরো থেকে পঁচিশ বৎসর। তারা তাদের মতামত ব্যক্ত করল। একজন বলল, আড়াই হাজার টাকা হলে একটা ঠেলা গাড়ি হয়। আর পাঁচশ টাকা হলে কাঁচা শাকসবজি বাড়ি বাড়ি বিক্রি করতাম। আর একজন বলল, দেড় হাজার টাকা হলে পুরানো সাইকেল পাওয়া যায়। বাকি দেড় হাজার টাকার ধান কিনে চাল করে বাড়ি বাড়ি ফেরি করে বেড়াতাম। হাঁটাটা ডায়াবেটিস রুগীর জন্য অপরিহার্য কর্ম। দশ জনই তিন হাজার টাকা হলেই করে খেতে পারবে বলে জানাল।
শুরু হল পথচলা- পুনর্বাসন কার্যক্রম। আজ অবধি এই পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। কলেবরে বেড়েছে। এখন চল্লিশ হাজার টাকা প্রতি রোগীর জন্য বরাদ্দ হয়। বয়স্ক হলে বিশ পঁচিশ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। এই কার্যক্রম সুষ্ঠু ভাবে আজ অবধি চলছে। বিশ কিস্তিতে পরিশোধ করে আসছে ঋণ গ্রহীতারা। কোন ডায়াবেটিস রুগী এর ব্যত্যয় ঘটায় নি। কোন ঋণগ্রহিতা ঋণ শোধ না করে মারা গেলে, তাদের পরিবার/গ্রহীতাদের সে ঋণ পরিশোধ করতে হয় না।
অনেক প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল আমার শেরপুরের পথচলা। অনেকেরই অবিশ্বাস সন্দেহ সাথে নিয়ে পথ চলতে শুরু করেছিলাম। এক সময় সেই অনেকেরই ভরসার স্থল হয়ে উঠতে পারলাম আর আমিও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলাম। যে ডায়াবেটিস চিকিৎসা প্রদান শুরু ছোট্ট পরিসরে আমার পিতার টিনের বাড়িতে। ২০১০ এ এটা স্থায়ী রূপ পেল মাধবপুরে এসে। তবে এখনও অনেক পথ চলা বাকি এর পরিপূর্ণ রূপে আবির্ভূত হতে।
আপনাদের সহায়তা আমাদের সাথে থাকলে আমরা সব বাঁধা অতিক্রম করে সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো- ইনশাল্লাহ।